Table of Contents
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন পাঠ্যবই ও যুগান্তকারী পরিবর্তন
img credit: Dainikshiksha
দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় আসছে এক সুদূরপ্রসারী ও বিশদ পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মুখস্থ বিদ্যা ও পরীক্ষা কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি বের করে আনার এক সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। শিক্ষার্থীদের স্কুলজীবনকে আরও আনন্দময়, জীবনমুখী ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্তরে যুক্ত হতে যাচ্ছে চারটি নতুন ও ভিন্নমাত্রার আধুনিক পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, সুদৃঢ় নীতি-নৈতিকতা গঠন, সৃজনশীল চিন্তাশক্তির উন্মেষ এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই যুগান্তকারী বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: আনন্দময় শিক্ষা’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামের দুটি চমৎকার বই।
জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির উচ্চপর্যায়ের সভা
নতুন এই পাঠ্যবইগুলোর অনুমোদন এবং সার্বিক রূপরেখা চূড়ান্ত করতে সম্প্রতি রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই উচ্চপর্যায়ের সভায় উপস্থিত ছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। পুরো সভাটির সভাপতিত্ব করেন জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সম্মানিত সভাপতি ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। সভায় নতুন অনুমোদিত বই দুটির বিভিন্ন অধ্যায়, বিষয়বস্তু এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়। শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা আশা প্রকাশ করেন যে, এই বইগুলো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আরও আকর্ষণীয় করবে এবং তাদের ভেতর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করবে।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: আনন্দময় শিক্ষা’ বইয়ের বিস্তারিত অধ্যায়সমূহ
ষষ্ঠ শ্রেণীর জন্য প্রণীত ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: আনন্দময় শিক্ষা’ বইটিতে মোট আটটি আকর্ষণীয় অধ্যায় রাখা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে:
- আমি ও আমরা: এই অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ব্যক্তিগত শক্তি, দুর্বলতা, অনুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে শিখবে। পাশাপাশি নিজেকে, অন্যকে এবং এই পৃথিবীকে ভালোবেসে সত্যিকারের সুনাগরিক হয়ে ওঠার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করবে।
- আমার স্বাস্থ্য, আমার পুষ্টি: সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এখানে।
- নিরাপদ থাকি, নিরাপদ রাখি: ট্রাফিক আইন সম্পর্কে গভীর সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে এখানে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।
- প্রকৃতির সাথে খেলি: পরিবেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও প্রকৃতি রক্ষায় ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ বাড়ানোর চমৎকার সব পাঠ রয়েছে।
- নতুন কিছু করি: নিত্যনতুন বিষয় শেখা, গভীর চিন্তা করা এবং নিজস্ব ভাবনা থেকে সৃজনশীল কিছু তৈরি করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- পরিষ্কার থাকি, পরিচ্ছন্ন থাকি: ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমে একটি রোগমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর জীবন গড়ে তোলার জোর তাগিদ রয়েছে।
- আমার দিন, বিশেষ দিন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবস উদযাপনের মাধ্যমে নিজেদের সুমহান ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানতে এবং শ্রদ্ধা করতে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- আনন্দে থাকি, আনন্দে রাখি: নিজের ও চারপাশের মানুষের সুখ-দুঃখে সহানুভূতিশীল হওয়া, সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা এবং বিপদে একে অপরকে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করা।
‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ের মূল বিষয়বস্তু ও অধ্যায়
শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী ও দক্ষ করে তোলার জন্য প্রণীত ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটিতে মোট সাতটি সুবিন্যস্ত অধ্যায় রয়েছে:
- কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি: চারপাশের নানা কাজের জ্ঞান, সঠিক কর্মপদ্ধতি, হাতে-কলমে অনুশীলন এবং কাজের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
- চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব: আধুনিক প্রযুক্তির প্রাথমিক ধারণা এবং পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে প্রযুক্তির অপরিসীম গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
- যারা গড়ে, তারাই বদলায়: সৃজনশীলতা ও নতুন উদ্ভাবনে দক্ষ মানুষের ভূমিকা এবং নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দক্ষতা সঠিকভাবে শনাক্ত করার ক্ষমতা অর্জন।
- সমস্যা দেখি ও সমাধান করি: প্রাত্যহিক জীবনের চারপাশের বিভিন্ন সমস্যা সাহসিকতার সাথে চিহ্নিত করা এবং কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তার স্থায়ী সমাধান বের করার পদ্ধতি।
- ছোটো উদ্যোগ, বড়ো সম্ভাবনা: ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সফল উদ্যোক্তার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা এবং খুব সহজ উপায়ে আয়ের হিসাব-নিকাশ পরিচালনা করার প্রাথমিক শিক্ষা।
- ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা: আগামী দিনের পেশা জগৎ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সেই অনুযায়ী চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া বা উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা।
- সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন: সবুজ প্রযুক্তির ধারণা ও পরিবেশবান্ধব অভ্যাস চর্চার মাধ্যমে সম্পদের অপচয় রোধ করে একটি নিরাপদ ও টেকসই জীবনযাপন প্রণয়ন করা।
শিক্ষানীতির আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী একটি আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মূলত এই বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং স্কুলগুলোতে অতি শীঘ্রই ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে এমনভাবে যুক্ত করা হচ্ছে যাতে সাধারণ পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টির জন্য ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ (একটি শিশু একটি গাছ) কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়মিত বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করা এবং পোষ্য প্রাণী পালনের মাধ্যমে তাদের মাঝে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা তৈরি করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রের যেকোনো সর্বশেষ আপডেট পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন talukdaracademy.com.bd ওয়েবসাইট।
সরকারের নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো মুখস্থ বিদ্যার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা প্রদান করা এবং ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের উপযোগী ও দক্ষ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
